নিজস্ব প্রতিবেদন
দৈনিক বাংলাদেশের ভোর।
সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রবীণ এই আওয়ামী লীগ নেতা।
৬৯’এর গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর, ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।
৫ আগস্টে গনঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের মামলার আসামি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। দীর্ঘ মেয়াদে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) অবস্থায় তিনি দীর্ঘদিন যাবত হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবন
ভোলা জেলায় জন্মগ্রহণকারী তোফায়েল আহমেদ ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তিনি ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে ভোলার বিভিন্ন আসন থেকে মোট ৯ বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সালেও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৫ আগস্ট পরবর্তী আইনি অবস্থান ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে ২০০২ সালে দায়ের হওয়া একটি পুরনো দুর্নীতি মামলা সচল করা হয়।
চলতি বছরের ৭ মে ২০২৬ তারিখে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত এই মামলায় তোফায়েল আহমেদসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় চার্জ গঠন (অভিযোগ গঠন) করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু করেন। শুনানির সময় তোফায়েল আহমেদ আদালতে অনুপস্থিত থাকায় এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলায় আদালত তাঁকে ‘পলাতক’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (Arrest Warrant) জারি করেন।
অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তি
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, স্ট্রোকের কারণে তোফায়েল আহমেদ বিগত কয়েক বছর ধরে হুইলচেয়ার নির্ভর ছিলেন এবং তাঁর শরীরের একপাশ অবশ ছিল। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে বিগত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে গুরুতর অবস্থায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে দীর্ঘদিন হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
আদালতের দৃষ্টিতে পলাতক আসামি হিসেবে পরোয়ানা জারির পর তাঁর মানসিক ও শারীরিক পরীক্ষার জন্য আইনজীবীরা আবেদন করলেও গুরুতর অসুস্থতার কারণে পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নিতে পারেনি। দীর্ঘ ৮ মাস হাসপাতালে শয্যাশায়ী থাকার পর আজ চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। আইনানুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।







