ডেস্ক নিউজ
দৈনিক বাংলাদেশের ভোর।
লাখো মানুষের অংশগ্রহণে জানাজার পর জাতীয় কবির সমাধি পাশে শায়িত হলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি। স্লোগানে স্লোগানে তাঁকে শেষবিদায় জানাল অগুনতি সমর্থক ও জনতা।
আজ শনিবার বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হয়।
তার আগে দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হয় ওসমান হাদির জানাজা। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ লাখো মানুষ অংশ নেন।
জুলাই আন্দোলনের মুখ ওসমান হাদি (৩২) গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরে দুর্বৃত্তের হামলায় আহত হন। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিন দিন পর নেওয়া হয়েছিল সিঙ্গাপুরে।
সেখানে চিকিৎসকদের সব প্রয়াস ব্যর্থ করে গত ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির চির বিদায় নেন। কফিনবন্দী হয়ে গতকাল শুক্রবার দেশে ফেরেন জুলাই আন্দোলনের এই সৈনিকের মরদেহ। তাঁর মরদেহ রাখা হয় শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে।
সেখান থেকে আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়েছিল পাশের সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ হৃদরোগ ইনস্টিউটে ফিরিয়ে এনে গোসল করানো হয়। এরপর বেলা ২টার আগে ওসমান হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়।
ওসমান হাদির জন্য শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। শোকের আবহের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের মিছিল সকাল থেকে ছুটতে থাকে সংসদ ভবন প্রঙ্গনে। মিছিলে স্লোগানে স্লোগানে উচ্চারিত হচ্ছিল ইনকিলাব জিন্দাবাদ। জানাজার সময় ২টায় দেওয়া হলেও তাঁর আগেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের দক্ষিণাংশের দুটো মাঠ ও আশপাশের এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঢোকেন। তবে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় সবাই সে সযুগোগ পাননি। গোটা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউজুড়ে কাতারবদ্ধ হয়ে জানাজায় অংশ নেন লাখো মানুষ। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজকে এখানে হাজির হয়েছে, পথে ঢেউয়ের মত লোক আসছে, সারা বাংলাদেশ জুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজকে এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে, তারা তাকিয়ে আছে, হাদিস কথা শোনার জন্য। আজকে বিদেশে যারা আছে, বাংলাদেশি এই মুহূর্তে তারাও হাদির কথা জানতে চায়। প্রিয় ওসমান হাদি তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসি নাই। এখানে তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছো এবং বাংলাদেশ যতদিন আছে তুমি সব বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আজকে তোমাকে, প্রিয় হাদিকে বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে আমরা ওয়াদা করতে এসেছি। তুমি যা বলে গেছো সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি, সেই ওয়াদা করার জন্য আমরা একত্র হয়েছি। সেই ওয়াদা শুধু আমরা নয়, পুরুষানুক্রমে বাংলাদেশের সব মানুষ পূরণ করবে। সেই ওয়াদা করার জন্যই আমরা তোমার কাছে আজকে এসেছি। সবাই মিলে যে যেখানেই আছি, তোমার যে মানব প্রেম, তোমার যে ভঙ্গি, মানুষের সঙ্গে উঠাবসা, তোমার যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সবাই প্রশংসা করছে। সেটা আমরা প্রাণে গ্রহণ করছি। যেটা যেন আমাদের মনে সব সময় জাগ্রত থাকে। আমরা সেটা অনুসরণ করতে পারি।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, তুমি আমাদের এমন এক মন্ত্র কানে দিয়ে গেছো সেই মন্ত্র বাংলাদেশের কেউ কোনদিন ভুলতে পারবে না। এই মন্ত্র চিরদিন আমাদের কানে বাজবে। সে মন্ত্র বাংলাদেশের বড় মন্ত্র হয়ে আমাদের জাতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তোমার মন্ত্র ছিল, চল বলবীর চির উন্নত মম শীর, এই উন্নত মম শীরের যে মন্ত্র তুমি দিয়ে গেছো, সেটা সন্তানের বাংলাদেশি সন্তানের জন্মলগ্ন থেকে যতদিন সে বেঁচে থাকবে। আমাদের শির কখনো নত হবে না। সেই মন্ত্র তুমি আমাদের দিয়ে গেছো। আমাদের সব কাজে প্রমাণ করব আমরা দুনিয়ার সামনে মাথা উঁচু করে চলবো, কারো কাছে মাথা নত করব না। সেই মন্ত্র তুমি আমাদের দিয়ে গেছো আমরা সেটা পূরণ করে যাবো।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, হাদি তুমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলে এবং সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নির্বাচন কীভাবে করতে হয় তারও একটা প্রক্রিয়া জানিয়ে গেছে আমাদের। সেই প্রক্রিয়া যেন আমরা সবাই মিলে গ্রহণ করি। কীভাবে প্রচার প্রচারণা কার্য চালাতে হয়, কীভাবে মানুষের কাছে যেতে হয়, কীভাবে মানুষকে কষ্ট না দিয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে বিনীতভাবে মানুষের কাছে আসতে হয়, সবকিছু তুমি শিক্ষা দিয়ে গেছো। আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করলাম, আমরা এই শিক্ষা চালু করতে চাই।
তিনি বলেন, আমরা সবাই আমাদের জীবনে আমাদের রাজনীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই, যাতে হাদি আমাদের জীবনে স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকে। হাদি তুমি হারিয়ে যাবে না। কোনদিন কেউ তোমাকে ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমাদের তোমার মন্ত্র পুরোপুর মনে করিয়ে দেবে। আমরা সেই মন্ত্র নিয়ে আজকে সামনের পথে এগিয়ে যাব। তোমাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে ওয়াদা করলাম আজকে তোমাকে আল্লাহর হাতে দিলাম, আমানত রেখে গেলাম, আমরা সব সময় তোমার কথা স্মরণ রেখে জাতির অগ্রগতির পথে চলতে থাকবো।









