হারুন-অর-রশিদ
স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক বাংলাদেশের ভোর।
সমাজ, দেশ, রাষ্ট্রে মরণব্যাধির মত মারাত্মক আকার ধারন করেছে জুয়া, মাদক। যা বর্তমানে প্রতিটি ব্যক্তি নাগরিকের জন্য উদ্বেগের বিষয়। সমাজের সকল মানুষ সচেতন না হলে এই মরণব্যাধি থেকে ব্যক্তি, পরিবার কেউই পরিত্রাণ পাবে না। জুয়া খেলা মধ্যে এখন অনলাইন জুয়া মারাত্মক আকার ধারন করেছে প্রতিটি ঘরে। জুয়ায় আসক্ত একজন ব্যক্তি খুব সহজই অনলাইন জুয়া খেলে থাকে মোবাইলে। অনলাইন জুয়া ও মাদক—উভয়ই অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং আসক্তিমূলক, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সহজে লভ্যতার কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনলাইন জুয়া ভয়াবহভাবে এগিয়ে রয়েছে। এটি মুহূর্তেই সর্বস্বান্ত করে, পারিবারিক ধ্বংস ও অর্থ পাচার করে বিদেশে। মাদক শারীরিক ক্ষতি বেশি করলেও, অনলাইন জুয়া ভার্চুয়াল মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
তুলনামূলক ভয়াবহতা:
অনলাইন জুয়া: স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজেই খেলা যায়, যা তরুণদের মধ্যে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এটি শুধু টাকা নষ্ট করে না, বরং মারাত্মক মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে।
বাংলাদেশে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ হলেও ব্যক্তিগতভাবে দুজন বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার ফলাফল নিয়ে, বা অন্য কিছু নিয়ে ‘বাজি’ ধরে বিজয়ীকে অর্থ বা মূল্যবান বস্তু দেয়ার চল রয়েছে।
আবার অনেক ক্লাব, অভিজাত এলাকা এমনকি ঘরের ভেতরে জুয়ার আসর বসার ঘটনাও নতুন নয়।
তবে এই জুয়া সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে। এ কারণে ঘরে বসেই মানুষ অনলাইনে বিভিন্ন জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন।
এতে অনেক সময় তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকছে না।
বাংলাদেশে জুয়া নিষিদ্ধ হলেও এসব জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন যেমন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখা গেছে এবং ইউটিউব চ্যানেলগুলোতেও প্রচার হতেও দেখা যাচ্ছে।
ইউটিউবে সম্প্রচারিত ধারাবাহিক নাটকে এমনই একটি অনলাইন জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন প্রচার করায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় এক ইউটিউবার এবং তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।
চব্বিশে ফেব্রুয়ারি তাদের নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের সঙ্গে ভারতীয় এক জুয়ার এজেন্টের গত তিন বছর ধরে জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচারের চুক্তি রয়েছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া বা বেটিং সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২০ অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ায় অংশগ্রহণ, অ্যাপ/ওয়েবসাইট তৈরি, প্রচার বা লেনদেন করলে ২ বছরের কারাদণ্ড, ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয় দণ্ড হতে পারে। সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল ব্যাংকিং বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে জুয়া খেলেও ধরা পড়লে এই কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
অনলাইন জুয়া ও বেটিং সংক্রান্ত প্রধান আইনসমূহ:
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫: এই অধ্যাদেশের ধারা ২০ অনুযায়ী, যেকোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জুয়া খেলা বা প্রচার করা অপরাধ।
শাস্তির বিধান: জুয়া আয়োজন, অংশগ্রহণ বা প্রচারের দায়ে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
অ্যাপ ও ওয়েবসাইট: অনলাইন জুয়া বা বেটিং সংক্রান্ত অ্যাপ বা ওয়েবসাইট তৈরি, পরিচালনা, প্রচার বা তাতে অংশগ্রহণ করা বেআইনি।
লেনদেন: মোবাইল ব্যাংকিং বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে জুয়ার অর্থ আদান-প্রদানও দণ্ডনীয় অপরাধ।
১৯ শতকের আইন: ঐতিহাসিকভাবে, ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ অনুযায়ীও বাংলাদেশে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ।
জুয়া বা বেটিং সম্পর্কিত কাজসমূহ শাস্তিযোগ্য:
অনলাইন জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে বাজি ধরা।
জুয়ার সাইটে রেজিস্ট্রেশন, হোস্টিং বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় (Facebook, YouTube, TikTok) জুয়ার প্রচারণা বা বিজ্ঞাপন দেওয়া।
জুয়ার অ্যাপে টাকা ডিপোজিট করা।
পুলিশের সাইবার ইউনিট, বিটিআরসি (BTRC) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে তৎপর এবং এ ধরনের সাইট ও লেনদেন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অনলাইন গেমের নামে অবৈধ জুয়া খেলবেন না। সব হারাবেন, ধ্বংস হবে আপনার জীবন।
মাদক: শারীরিক আসক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর কারণ। উভয়ই তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী মাদকের পরিমাণ ও ধরনের ওপর ভিত্তি করে শাস্তির সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত হয়। ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন/কোকেইন বা বড় চালানে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন (সর্বোচ্চ) এবং অল্প পরিমাণে মাদক পাওয়া গেলে ৬ মাস থেকে ৩ বছরের (সর্বনিম্ন) কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে, যার প্রধান ধারা ৩৬।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর প্রধান শাস্তির ধারা (৩৬):
সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড/যাবজ্জীবন): যদি কোনো ব্যক্তি ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন, কোকেইন বা সমজাতীয় মাদক উৎপাদন, চোরাচালান, বিক্রয় বা পরিবহন করেন, তবে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মাঝারি শাস্তি (৫-১০ বছর): মাদকদ্রব্যের পরিমাণ ৫ গ্রাম থেকে ২৫ গ্রামের মধ্যে হলে শাস্তি সাধারণত ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড।
সর্বনিম্ন শাস্তি (৬ মাস-৩ বছর): মাদকদ্রব্যের পরিমাণ খুবই কম হলে বা মাদক সেবনের অপরাধে ৬ মাস থেকে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ধারা:
ধারা ৯: মাদক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি নিষিদ্ধ।
ধারা ১০: মাদকদ্রব্যের ব্যবসা বা যোগানদার হিসেবে কাজ করা নিষিদ্ধ।
ধারা ৩৬ (১) সারণি: মাদকের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী বিস্তারিত শাস্তির বিবরণ রয়েছে।
জুয়া ও মাদক থেকে একজন ব্যক্তিকে দূরে রাখতে এবং সমাজ, দেশ, রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে সামজিক ঐক্য, আইনের শাসনকে সর্বোচ্চ পরিসরে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব রহমানের কাছে জোড় দাবী জনগণের জুয়া, মাদকের বিষয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ পরিলক্ষিত করা হোক।এছাড়াও আমার, আপনার, আমাদের সকলের দায়িত্ব হল ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন প্রতিটি মানুষ কার সাথে মিশছে, কোথায়, কার সাথে সঙ্গ দিচ্ছে, ভার্চুয়াল মাধ্যম ব্যবহার করে বা অনলাইনে কি করছে তার খোঁজ রাখা।







