এক লাখ টাকার ঋণ, বিনিময়ে জীবন—শ্রীপুরে তরুণকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৬

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

মোঃ আল আমিন

স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক বাংলাদেশের ভোর।

গাজীপুরের শ্রীপুরে সুদের টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে আতিকুল ইসলাম (১৮) নামে এক তরুণ মাছ বিক্রেতাকে অপহরণ করে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের পর হত্যা এবং আলামত নষ্ট করতে মরদেহ পুড়িয়ে গুম করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুরে গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালিয়াকৈর সার্কেল) মিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নিহত আতিকুল ইসলাম ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের মো. তাজুল ইসলামের ছেলে। তিনি শ্রীপুর উপজেলার মুলাইদ গ্রামে মাইনুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে ভাড়া থেকে ফেরি করে মাছ বিক্রি করতেন।

গ্রেপ্তাররা হলেন—ইমরান হাসান (২৪), টুটুল হাসান (২০), নাজমুল (৩৫), কামাল হোসেন (৩২), রুহানুল ইসলাম রুহান (২৩) ও আকবর (২৯)।
পুলিশ জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টার দিকে উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেংরা এলাকার বৃন্দাবন সংলগ্ন একটি গভীর জঙ্গল থেকে আগুনে পোড়ানো এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটির গলায় পোড়া কাপড় প্যাঁচানো ছিল এবং শরীরে চন্দ্রাকৃতির দাগ দেখা যায়। ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়।

পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য মরদেহটি গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় শ্রীপুর মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এ বি এম রুহুল কাইয়ুম বাদী হয়ে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় উপপরিদর্শক (এসআই) মো. লালচাঁন মিয়াকে।

মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় একটি বিশেষ আভিযানিক দল গঠন করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ইমরান হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আসামি নাজমুলের পরিচালিত একটি সমিতি থেকে আতিকুল নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

পরে আসামিরা তার অবস্থান শনাক্ত করে তাকে বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে তুলে এনে শ্রীপুরের মুলাইদ এলাকায় নাজমুলের বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে কাঁঠালপাতাভর্তি একটি বস্তায় ভরে উপজেলার টেংরা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বস্তার ওপর পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলে আসামিরা।
নিহতের মা ফজিলা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার দিকে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। পরে যোগাযোগ করতে চাইলে তারা জানায়, সে ভালো আছে—টাকা দিলে ছেড়ে দেবে। কিন্তু কয়েকদিন পরই আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলে মাছ ব্যবসার জন্য তাদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিল। সুদ হিসেবে কয়েক লাখ টাকা পরিশোধ করলেও তারা মূল টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে। ভয়ে সে বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু সেখান থেকেও তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে একটি পোড়া লাশের ছবি দেখে সন্দেহ হলে পুলিশকে জানাই। গ্রেপ্তারের পর জানতে পারি, আমার ছেলেকে কী নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।”
এ ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ