বিশেষ প্রতিবেদন
দৈনিক বাংলাদেশের ভোর।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগোলেও নিয়োগ ব্যবস্থায় মাত্র ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ পাওয়ায় উঠছে নানা প্রশ্ন। মালয়েশিয়ার Foreign Workers Centralized Management System (FWCMS)-এ শুক্রবার ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া, চাকরির অর্ডার বণ্টন কিংবা কর্মী পাঠানোর নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো স্পষ্ট নয়।

প্রশ্ন উঠেছে—২০২২ থেকে ২০২৪ সালের বিতর্কিত নিয়োগব্যবস্থার পর এবার কি সত্যিই উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজার তৈরি হবে, নাকি নতুন লাইসেন্স ও নতুন কাঠামোর আড়ালে পুরোনো প্রভাবশালীদেরই পুনরাগমন ঘটবে?
নতুন মোড়কে পুরোনোদের হাতছানি
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে পুরোনো সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গ।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদিত থাকলেও অভিযোগ ছিল, কার্যত সীমিতসংখ্যক এজেন্সি বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং চাকরির নিশ্চয়তা না থাকার মতো নানা অভিযোগের পর ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে। আদালতে সংশ্লিষ্ট মামলার চার্জশিট গৃহীত হওয়ার পর জনস্বার্থে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

অথচ এর মাত্র এক মাসের মাথায় FWCMS-এ নতুন করে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ পাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই একটি নতুন, উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার সূচনা, নাকি সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে কেন্দ্র করে আবারও বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে?
যদিও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এই ২৫টি এজেন্সিকে ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই, তবু অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে যখন অনিশ্চয়তা কাটছিল না, তখন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক নতুন আশার সঞ্চার করে।
গত ২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফর করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানান।
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন ও প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান শ্রমবাজার-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করে নতুন হালনাগাদ MoU তৈরির জন্য একটি Joint Working Group গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওটিতে শিল্পী হাবিব ওয়াহিদের জনপ্রিয় গান ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ ব্যবহৃত হওয়ায় তা নিয়ে নেটদুনিয়ায় তৈরি হয় ভিন্নমাত্রার আগ্রহ।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও আন্তরিকতা দেখে অনেকের প্রত্যাশা ছিল—এবার হয়তো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হবে আগের চেয়ে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত। কিন্তু FWCMS-এ মাত্র ২৫টি এজেন্সির নাম প্রকাশ পাওয়ার পর সেই প্রত্যাশার পাশাপাশি নতুন করে দেখা দিয়েছে সংশয়। কারণ, বাজারটি সবার জন্য উন্মুক্ত হবে নাকি সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে পরিচালিত হবে—এখনো সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
তাহলে কি টাকার বিনিময়েই নিয়োগ হবে?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অতীতের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি ছিল অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগপর্বে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় গেলেও অনেক কর্মীর কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং সংস্থাটি অভিযুক্তদের সম্পদের হিসাবও যাচাই করছে।
এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। কিছু ক্ষেত্রে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ারও অভিযোগ করেন।
এখন প্রশ্ন হলো—নতুন ব্যবস্থায় একজন সাধারণ কর্মীর মালয়েশিয়া যেতে মোট কত টাকা খরচ হবে?
এখনো সরকারিভাবে নতুন নিয়োগব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ খরচ ও ফি কাঠামো প্রকাশ না হওয়ায় এই প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত। ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর যদি শ্রমিকদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক অর্থ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে অতীতের একই সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
আর তাই শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় দাবি—নিয়োগের আগেই সরকারিভাবে নির্ধারিত মোট খরচ প্রকাশ করতে হবে এবং নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।
শেষ পর্যন্ত কি নির্ভর করছে শ্রমিকদের ভাগ্যের ওপর?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অতীতের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ২০২৩-২৪ সালের নিয়োগপর্বে এমন অভিযোগও সামনে আসে যে, কিছু কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছে প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান পাননি। কেউ কেউ দীর্ঘদিন বসে ছিলেন, আবার কেউ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। এসব ঘটনার কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি অংশকে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নতুন করে যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবেন, তাঁদের চাকরির নিশ্চয়তা কে দেবে?
নিয়োগকর্তার বাস্তব অস্তিত্ব, বৈধ জব অর্ডার, বেতন, আবাসন, কর্মক্ষেত্র এবং চুক্তির শর্ত যাচাই না করে শুধু ভিসা বা কলিং ভিসার আশ্বাসে কর্মী পাঠানো হলে অতীতের সংকট পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে—সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় চাকরির নামে কোনো অর্থ লেনদেন, পাসপোর্ট সংগ্রহ, মেডিকেল পরীক্ষা কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম করা যাবে না। সরকার বলেছে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে এসব কার্যক্রম অননুমোদিত হিসেবে বিবেচিত হবে।
তাই এবার শ্রমিকের ভাগ্য যেন দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা অস্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
উন্মুক্ত শ্রমবাজারের প্রতিশ্রুতি কোথায়?
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর দুই দেশই স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে।
এমনকি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে এবং শুরুতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান BOESL-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে এখন FWCMS-এ ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পরও নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো—কীভাবে কর্মী বাছাই হবে, কীভাবে জব অর্ডার বিতরণ হবে, সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি কীভাবে অংশ নেবে এবং শ্রমিকের ব্যয় কত হবে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
তাই উন্মুক্ত শ্রমবাজারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারই কি এবার শেষ কথা?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার নয়; লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। তাই নতুন করে বাজার খোলার আগে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
সরকার ইতোমধ্যে ৪৯টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনও মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত চালাচ্ছে।
এখন ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—নতুন ব্যবস্থায় পুরোনো সিন্ডিকেটের কোনো সুযোগ থাকবে কি না।
শ্রমিকদের স্বার্থে প্রয়োজন—
এক. নিয়োগপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রকাশ;
দুই. সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় স্পষ্টভাবে ঘোষণা;
তিন. প্রতিটি জব অর্ডার ও নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাই;
চার. শ্রমিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কঠোর নজরদারি;
পাঁচ. FWCMS-এর মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত;
ছয়. কোনো এজেন্সি অনিয়ম করলে দ্রুত লাইসেন্স স্থগিত ও আইনগত ব্যবস্থা।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার সত্যিই যদি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। কিন্তু নতুন নাম, নতুন লাইসেন্স ও নতুন প্ল্যাটফর্মের আড়ালে যদি পুরোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ফিরে আসে, তাহলে আবারও সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ শ্রমিককেই।
তাই এখন প্রশ্ন একটাই—মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কি সত্যিই শ্রমিকের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে, নাকি পুরোনো সিন্ডিকেটই নতুন মোড়কে ফিরে আসছে?
এর উত্তর দেবে আগামী দিনের নিয়োগপ্রক্রিয়া।







